বৃহস্পতিবার ২৮শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ভুল চিকিৎসায় শিশুর হারানো পায়ের দাম এক লাখ! ভুয়া ডাক্তারকে বাচাতে মরিয়া স্থানীয় প্রভাবশালীরা

উত্তরা ডেস্ক   |   রবিবার, ১০ অক্টোবর ২০২১ | প্রিন্ট

ভুল চিকিৎসায় শিশুর হারানো পায়ের দাম এক লাখ! ভুয়া ডাক্তারকে বাচাতে মরিয়া স্থানীয় প্রভাবশালীরা

গ্রাম্য সালিসেই নির্ধারিত হলো কেরানীগঞ্জে আলোচিত কবিরাজের ভুল চিকিৎসায় পা হারানো শিশুর ভবিষ্যৎ! কোনো মামলা-মোকাদ্দকা না করার শর্তে স্থানীয় প্রভাবশালীরা শিশুর ডান পায়ের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন মাত্র এক লাখ টাকা। গৃহহীন অসহায় পরিবারটি যেখানে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল তাদের একমাত্র ছেলে সন্তানটিকে ঘিরে, সেখানে কবিরাজের ভুল চিকিৎসায় সব স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেল।

এক মাস বয়সী ফুটফুটে ছেলে অনিক এখন যেন তাদের দীর্ঘশ্বাস। কি হবে ছেলের ভবিষ্যৎ? কিভাবে পাড়ি দেবে জীবনের দীর্ঘপথ? ছেলেইবা করবে কি ভবিষ্যতে? নানা চিন্তায় এক দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন সীমা-আবুল বাসার দম্পতি।

ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার আব্দল্লাহপুর কলাকান্দী মধ্যপাড়া এলাকায়। গত ৯ সেপ্টেম্বর সীমা-বাসার দম্পত্তির ঘর আলো করে জন্ম নেয় শিশু ছেলে অনিক। জন্মের পর থেকেই শিশুটির কান্নাকাটি না কমায় জন্মের ৬ষ্ঠ দিন চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে স্থানীয় কবিরাজ ও কথিত ডাক্তার কিশোর দেবের কাছে নিয়ে যায় তার মা-বাবা। সেখানে কবিরাজ শিশুটিকে ঝাড়-ফুঁকের পাশাপাশি একটি ট্রাইজন নামক ইনজেকশন পুশ করে। শিশুটিকে বাসায় নিয়ে এলে কান্না না থামায় দ্বিতীয় দিন আবারও সেই কবিরাজের নিকট নিয়ে গেলে সেইদিনও আরো একটি ইনজেকশন পুশ করেন কবিরাজ।

এতে শিশুর পা ফুলে গেলে কবিরাজ নিজেই প্রথমে শিশুটিকে স্যার সলিমুল্লাহ্ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে শিশু অনিকের অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার আজগর আলী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ডাক্তার শিশুটিকে ভর্তি করাতে না পেরে বাংলাদেশ স্পেশালাইড হাসপাতালে ভর্তি করান। তবে সেখানে আইসিও না থাকায় ধানমন্ডিতে মাদার কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসক জানান, শিশু অনিকের ডান পায়ের হাড়ে পচন ধরেছে। এখন তার পা কাটা ছাড়া কোনো উপায় নেই। অবশেষে গত ২৬ সেপ্টেম্বর শিশুটির পা কেটে ফেলা হয়।

ছেলে অনিকের পা কাটার ২৩ দিন পর নির্মম ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ প্রচার হয় দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে। থানার ওসি থেকে শুরু করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পর্যন্ত সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেন পরিবারটিকে, তবে এর পরই পাল্টে যায় সব চিত্র। কবিরাজ ও কথিত ডাক্তারকে বাঁচাতে নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। স্থানীয় খবির মেম্বার, তাইজুল ইসলাম, বাতেন, জাহাঙ্গীরসহ কিছু প্রভাবশালী মাতবর মিলে ১ লাখ টাকায় মিমাংসা করে দেন ঘটনাটি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন কোনো দাবি-দাওয়া না করতে পারে সে জন্য ভুক্তভোগী অনিকের বাবা-মার সিগনেচার নেওয়া হয় সাদা স্ট্যাম্পে।

শিশুর বাবা আবুল বাসার অভিযোগ করে বলেন, কবিরাজ না বলে ইনজেকশন পুশ করার কারণে আমার আদরের ধন আজ পঙ্গু। আমার মতো কেউ যেন হাতুড়ে চিকিৎসাকের কাছে না যায় আর কোনো শিশুর পা হারাতে না হয়।

এক লাখ টাকার বিনিময় কেন আপস হলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলাকায় বসবাস করতে হবে, আমরা গরিব মানুষ তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরা থাকতে পারব না। তবে আমি টাকা নয় ছেলের অঙ্গহানীর বিচার চাই।

এ ব্যাপারে স্থানীয় মাদবর খবির মিয়া বলেন, শিশুটির বাবা আমার আত্মীয় কবিরাজ তার ভুলের সব ঘটনা সত্যি বলেছে এবং কবিরাজ নিজে বাচ্চার চিকিৎসার সব খরচ দেবে বলে হাসপাতালে ভর্তি ও করিয়েছেন। জানতে পেরেছি ২ লাখ ১০ হাজার টাকার খরচ করেছে। পরিবার আমাকে জানিয়েছেন পা কাটার পর নাকি সে মাদার কেয়ার হাসপাতালে টাকা পরিশোধ করে চলে এসেছে। আরো এক লাখ টাকা ছেলের বাবাকে দেওয়া হয়েছে ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে।

কবিরাজ দেব কিশোর ওরফে ধীমান সরকার নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি একজন পল্লী চিকিৎসক ও আমার বাবা কবিরাজি করতেন, তার কাছ থেকে শিখে আমিও উৎসাহ পাই এবং ঝাড়-ফুঁক করে আসছি। আমি প্রায় ৩৫ বছর ধরে এ কাজ করছি। ওই শিশুটির বয়স যখন ৬ দিন তখন শিশুটিকে তার মা আমার কাছে নিয়ে আসলে আমি তাকে নাভী শুকানো ও ঠান্ডা ভালো করার জন্য দুদিন ঝাড়-ফুঁক ও দুটি ট্রাইজন ইনজেকশন পুশ করি। পরে জানতে পারি যে তার পায়ে ইনফেকশন হয়েছে। তার দাবি জন্মের পর থেকে তার ইনফেকশন ছিল।

স্থানীয়রা মিমাংসা করে দেয় যে, শিশুটিকে চিকিৎসা বাবদ সকল খরচ আমি বহন করব। আমি তাই করেছি। প্রথমে ঢাকার আজগর আলী হাসপাতাল ও বাংলাদেশ স্পেশালাইড হাসপাতাল এবং শেষে ধানমন্ডি মাদার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করি। শেষে গত ২৬ সেপ্টেম্বর শিশুটির পা কেটে ফেলতে হয়। এতে আমার মোট ২ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পরে আরো এক লাখ টাকা দিলাম। এর পর আর কি থাকে আমি বুঝি না।

এ ব্যাপারে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারটি আমরা থানায় আনতে পারছি না, কোনো অভিযোগও করছে না। আমরা ব্যাপারটা দেখছি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কেরানীগঞ্জ সার্কেল) শাহাবুদ্দিন কবির জানান, সংবাদ প্রকাশের পরপরই পুলিশ আসামিকে আটক করতে অভিযানে নামে। পুলিশের দুই দিনের অক্লান্ত চেষ্টায় আসামি দেব কিশোর সরকারকে আটক করতে সক্ষম হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কবিরাজ ও কথিত ডাক্তার দেব কিশোর সরকার পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন।

সূত্র:কালেরকণ্ঠ

উত্তরা প্রতিদিন/ তৌফিকুল ইসলাম

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১২:৩৬ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১০ অক্টোবর ২০২১

uttaraprotidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
এনায়েত করিম সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)
প্রধান কার্যালয়

৫৩০ (২য় তলা), দড়িখরবোনা, উপশহর মোড়, রাজশাহী-৬২০২

ফোন: ০৭২১-৭৬০১৪৩, ০১৯৭৭১০০০২৭

E-mail: uttaraprotidin@gmail.com