রবিবার ১৭ই অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১লা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

দেশের কিছু বিজ্ঞানীর অবহেলার কারণে মানবদেহে বঙ্গভ্যাক্সের পরীক্ষাপ্রক্রিয়ায় দেরি

উত্তরা ডেস্ক   |   সোমবার, ০৪ অক্টোবর ২০২১ | প্রিন্ট

দেশের কিছু বিজ্ঞানীর অবহেলার কারণে মানবদেহে বঙ্গভ্যাক্সের পরীক্ষাপ্রক্রিয়ায় দেরি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্ভাব্য টিকার তালিকায় নাম থাকার পরও দেশীয় একমাত্র প্রস্তাবিত করোনার টিকা ‘বঙ্গভ্যাক্স’-এর মানবদেহে পরীক্ষার প্রক্রিয়া এখনো শুরু করতে পারেনি এর উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক। এরই মধ্যে দেশে ইঁদুর ও বানরের দেহে এই টিকা প্রয়োগ করে সন্তোষজনক কার্যকারিতা মিলেছে।

ওষুধ ও টিকা বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, দেশের কিছু বিজ্ঞানীর অবহেলার কারণে মানবদেহে বঙ্গভ্যাক্সের পরীক্ষাপ্রক্রিয়ায় সময় লেগে যাচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিচার্স কাউন্সিল (বিএমআরসি) মহলবিশেষের প্রভাবে প্রয়োজনীয় অনুমোদনপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছে। এ ক্ষেত্রে দেশের বড় বড় ওষুধ কম্পানির প্রভাব আছে বলে মনে করেন তাঁরা। টিকাটির উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেকের পক্ষ থেকেও একই ধরনের বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।

দেশের বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলেছেন, বিশ্বে এখন পর্যন্ত যেসব টিকা তৈরি করা হয়েছে এর অনেকগুলোর ক্ষেত্রেই বানরের দেহে পরীক্ষা লাগেনি। কিংবা একই সঙ্গে প্রাণী ও মানবদেহে পরীক্ষা চালানো হয়েছে। বিএমআরসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা প্রয়োজনীয় অনুমোদন এরই মধ্যে দিয়ে দিয়েছে। এখন আর তাদের হাতে কিছু নেই।

গত বছর ২ জুলাই গ্লোব বায়োটেক করোনার টিকা উদ্ভাবনের ঘোষণা দেওয়ার পর দেশের কোনো কোনো বিজ্ঞানী এ ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারেননি। যদিও তাঁদের কেউ কেউ পরে বঙ্গভ্যাক্স টিকার গবেষণায় যুক্ত হয়েছেন।

এই টিকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা দলের অন্যতম সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নিল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকে না জেনেই বা অন্য কোনো কারণে দেশীয় একটি প্রতিষ্ঠানের এমন বড় উদ্যোগটি নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে। অথচ বিশ্বে অনেক অখ্যাত কম্পানিও বিভিন্ন সময় খুব ভালো টিকা উদ্ভাবন করেছে। এমনকি এখন পর্যন্ত কভিডের যতগুলো টিকা মানবদেহে প্রয়োগ হচ্ছে এর বেশ কয়েকটিরই বানরের দেহে পরীক্ষা চালাতে হয়নি, বরং ইঁদুরের পর সরাসরি মানবদেহে কিংবা একই সঙ্গে প্রাণী ও মানবদেহে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ফলে ওই সব টিকায় অগ্রগতি বেশ দ্রুত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা সেটি শুধুই দীর্ঘায়িত করেছি।’

গত বছর টিকা উদ্ভাবনের ঘোষণা দেওয়ার প্রায় সাড়ে তিন মাসের মাথায় ১৫ অক্টোবর গ্লোব বায়োটেকের তিনটি টিকাকে সম্ভাব্য টিকা প্রার্থীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি প্রাণিদেহে পরীক্ষা ও আনুষঙ্গিক গবেষণা শুরু করে। তারা ইঁদুরের দেহে বঙ্গভ্যাক্স টিকার পরীক্ষা চালায়। এরপর চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি বঙ্গভ্যাক্সের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের নীতিগত পরীক্ষার জন্য বিএমআরসির কাছে প্রটোকল জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। বিএমআরসির চাহিদা অনুযায়ী সব তথ্য দিয়ে সংশোধিত প্রটোকল জমা দেওয়া হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি। এরপর গত ২২ জুন বিএমআরসি মানবদেহে বঙ্গভ্যাক্সের পরীক্ষা চালানোর অনুমতি দেয়। যদিও এর আগে বানর বা শিম্পাঞ্জির দেহে পরীক্ষা করার শর্ত দেওয়া হয়। গত ১ আগস্ট বানরের দেহে পরীক্ষা শুরু করে, যা শেষ হয় ৩০ সেপ্টেম্বর। এখন আরেকটি ধাপে এই টিকা যেকোনো ভেরিয়েন্টের ক্ষেত্রে কার্যকর কি না, সেই চ্যালেঞ্জ পরীক্ষা করছে। এ দুটি পরীক্ষার ফলাফল আগামী ১৫ অক্টোবর ঔষধ প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হবে। এর পরের ধাপ মানবদেহে পরীক্ষা। এ ক্ষেত্রে প্লাসিবো ছাড়াই পরীক্ষাটি হবে। এর ফলাফলের ভিত্তিতেই সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাণিজ্যিকভাবে টিকা উৎপাদনের অনুমতি দেবে। যদিও এরই মধ্যে মানবদেহে প্রয়োগের জন্য টিকা উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদনে যাওয়ার আগ পর্যন্তই এক বছরের বেশি সময় কেটে গেছে।

ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ-নাইট্যাগের সদস্য অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন তাদের ক্যান্ডিডেট তালিকায় বাংলাদেশের টিকার নাম তুলেছে, তখন ন্যূনতম তথ্য-উপাত্ত দেখেই সেটা করেছে। অনেক টিকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় নাম নেই, তবু সেই কম্পানি নিজ দেশের অনুমোদন নিয়ে গবেষণা করে ফেলেছে। বিএমআরসি ইঁদুরের শরীরে বঙ্গভ্যাক্সের সফল পরীক্ষার ফল পেয়েছে বলেই পরবর্তী ধাপের অনুমতি দিয়েছে। অবশ্য তিনি মনে করেন, এ ক্ষেত্রে সময় নষ্ট করা হয়েছে খুব বেশি। এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দিতে হয় দ্রুত।

ডা. বে-নজীর বলেন, ‘ঝুলিয়ে রাখার ব্যাপারটি দুঃখজনক। টিকাটির ট্রায়াল করা হলে তখনই প্রমাণিত হবে এটি কার্যকর কি না। কার্যকর না হলে বাতিল হয়ে যাবে, কার্যকর হলে তো দেশের জন্যই বড় চমক হয়ে আসবে। কিন্তু শুধু ছোট একটি কম্পানি এমন একটি বড় উদ্যোগ নিয়েছে বলেই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কারণে পরীক্ষা দীর্ঘায়িত হবে বা পরীক্ষা হবে না, সেটা মোটেই সমীচীন নয়।’

গ্লোব বায়োটেকের সিনিয়র ম্যানেজার (কোয়ালিটি অ্যান্ড রেগুলেটরি) ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন মনে করেন, তাঁদের বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী মহলবিশেষের অবজ্ঞা বা কাজটি করে ফেললে তাদের চেয়ে গ্লোব বায়োটেক এগিয়ে যাবে, সেই মনোভাবের কারণেই পরীক্ষার পর্যায় দীর্ঘায়িত হয়েছে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সরকারের সহযোগিতা পেয়েছি। সরকার গঠিত একটি টেকনিক্যাল টিম আমাদের গবেষণাগার পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছে, পরবর্তী সময়ে ঔষধ প্রশাসন মানবদেহে ট্রায়ালের জন্য বঙ্গভ্যাক্স উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে এবং সরকার এখনো বানরের ওপর ট্রায়ালে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এত সহযোগিতা করার পরও শুধু বিএমআরসির দীর্ঘসূত্রতার কারণে বঙ্গভ্যাক্সের আলোর মুখ দেখতে দেরি হচ্ছে। তবে এবার আশা করি বিএমআরসি আর দেরি করবে না। আমরা আগামী মাসেই সবাইকে চমক দিতে পারব, যা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বেও।’

ড. মহিউদ্দিন দাবি করেন, এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভেরিয়েন্টসহ ১১টি ভেরিয়েন্ট বিভিন্ন সময় বিশ্বের নানা দেশে সক্রিয় ছিল। এই ১১টি ভেরিয়েন্টের ক্ষেত্রে পরীক্ষা করে প্রতিটিতেই বঙ্গভ্যাক্সের কার্যকারিতা মিলেছে। এ ছাড়া এক ডোজের এই টিকার জন্য আরো আগে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। কিন্তু দেশের টিকা আগে দেশেই পরীক্ষার অনুমতি না পেলে অন্য দেশে সেটা করা যাবে না।

বানরের দেহে পরীক্ষার সফলতা তুলে ধরে ড. মহিউদ্দিন বলেন, তাঁরা ৩৬টি বানরের ওপর করোনার সব ধরনের ভেরিয়েন্টের জন্য প্রথমে এক ডোজ টিকা প্রয়োগ করেন। এতে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতা পাওয়া গেছে। এই বিষয়টিকেই অনেকেই ইতিবাচকভাবে দেখছে। পরীক্ষা পর্যায়ে কোনো বানরেরই ক্ষতি হয়নি বা বিরূপ প্রভাব দেখা যায়নি। ফলে এই টিকা এক ডোজই যথেষ্ট। তিনি বলেন, ‘এখন আমরা চ্যালেঞ্জ ট্রায়াল চালাচ্ছি। এ মাসের মাঝামাঝি সময়ে এর ফলাফল তৈরি করে বিএমআরসিতে জমা দিতে পারব বলে আশা করি।’

বঙ্গভ্যাক্সের পরীক্ষা পর্যায়ে পর্যবেক্ষণে যুক্ত একটি সরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের একজন গবেষক নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএমআরসি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নৈতিক অনুমোদন দিতে পাঁচ মাস সময় নিয়েছে। বানরের ওপর পরীক্ষার শর্ত দিতে এত দীর্ঘ সময় কেন লাগবে? সেই কারণে নানা সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, মডার্নার টিকা মডিফায়েড এমআরএনএ দিয়ে তৈরি। অন্যদিকে ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকায় এমআরএনএর সঙ্গে ভাইরাসের তিনটি প্রোটিন যুক্ত। কিন্তু বঙ্গোভ্যাক্স টিকাটি প্রাকৃতিভাবে বিশুদ্ধ এমআরএনএ দিয়ে তৈরি, তাই এটি সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ও কার্যকর হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, মডার্না ইঁদুরের দেহে পরীক্ষা করেই মানবদেহে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা করেছে, এরপর মানবদেহে তৃতীয় পর্যায় ও বানরের ওপর পরীক্ষা একসঙ্গে করেছে। ফাইজার-বায়োএনটেক মানবদেহে ও প্রাণিদেহে একসঙ্গে পরীক্ষা করেছে।

জানতে চাইলে বিএমআরসি পরিচালক অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বঙ্গভ্যাক্সের বিষয়ে আমাদের যা করার করেই দিয়েছি। বানরের ওপর পরীক্ষার ফলাফলসহ পরবর্তী সব কিছুই দেখবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।’ তাচ্ছিল্যের অভিযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তো নথিপত্র সব সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে জমা দিয়েছিলাম। তারা সময় নিয়েছে। প্রয়োজন ছিল বলেই হয়তো এ সময় লেগেছে। ইচ্ছাকৃতভাবে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার কিছু নেই।’

সূত্র:কালেরকণ্ঠ

উত্তরা প্রতিদিন/ তৌফিকুল ইসলাম

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১:০০ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০৪ অক্টোবর ২০২১

uttaraprotidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
এনায়েত করিম সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)
প্রধান কার্যালয়

৫৩০ (২য় তলা), দড়িখরবোনা, উপশহর মোড়, রাজশাহী-৬২০২

ফোন: ০৭২১-৭৬০১৪৩, ০১৯৭৭১০০০২৭

E-mail: uttaraprotidin@gmail.com