সোমবার ১৭ই জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

খুন করতেও হাত কাঁপছে না কিশোর গ্যাং এর, ‘মহাবিপদে’ পুলিশ

উত্তরা ডেস্ক   |   শনিবার, ০২ অক্টোবর ২০২১ | প্রিন্ট

খুন করতেও হাত কাঁপছে না কিশোর গ্যাং এর, ‘মহাবিপদে’ পুলিশ

ঢাকার কামরাঙ্গীর চর পূর্ব রসুলপুর রনি মার্কেটের ৫ নম্বর গলি। রাত সাড়ে ১১টা। আশপাশের বাসাবাড়িতে রাতের খাওয়া শেষে শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বেশির ভাগ মানুষ। তবে তখনো গলিতে চলছে একদল কিশোরের আড্ডা, মাদক সেবন। এর মধ্যেই সেখানে এক কিশোরের মোবাইল ফোন নিয়ে আরেকজন খেলতে চাইলে দুজনের মধ্যে বসচা বাধে। প্রথমে কথা-কাটাকাটি, এরপর হাতাহাতি। এক পর্যায়ে নিজের পকেটে থাকা চাকু (সুইচ গিয়ার) অন্য কিশোরের পেটে ঢুকিয়ে দেয় একজন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক আহত ওই কিশোর রিপনকে (১৬) মৃত ঘোষণা করেন।

গতকাল শুক্রবার ওই এলাকায় গিয়ে আশপাশের মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে গত বুধবার সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের এই চিত্র পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী জানায়, করোনাভাইরাস অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসায় জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যও আগের মতো বাড়ছে। তারা বরাবরই বেপরোয়া। বিশেষ করে সন্ধ্যার পরপরই মাদক সেবন, হৈ-হুল্লোড় ও মারামারি নিত্যদিনের ঘটনা।

এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার বিষয়ে জানতে চাইলে কামরাঙ্গীর চর থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান অনেকটা অসহায়ত্বের সুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই কিশোরদের নিয়ে মহাবিপদে আছি! বয়স কম হওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা যায় না। প্রতিদিনই অন্তত ১০-১৫ কিশোরকে নানা অপরাধের জন্য আটক করে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় দিই, কিন্তু তাতেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছি না।’

রিপন হত্যার প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ওসি বলেন, অভিযুক্ত কিশোরের বয়স ১৫ বছর। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই সুজন বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামিকে আটক করা হয়েছে। নিহত রিপন গাউছিয়া মার্কেটে একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করত।

রিপন হত্যাকাণ্ডের দুই সপ্তাহ আগে ওই এলাকায় সানোয়ার হোসেন নামের আরেক কিশোর খুনের শিকার হয়। এই হত্যাকাণ্ডেও জড়িত একটি কিশোর গ্যাং। আর সানোয়ার হত্যার তিন দিন আগে পুরান ঢাকার লালবাগের ৪৭/১ ডুরি আঙ্গুলি লেনের পাঁচতলা একটি ভবনের ছাদে হাফিজ নামের এক কিশোরকে গলা কেটে হত্যা করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

গত এক বছরে শুধু রাজধানীতেই কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ৩০ কিশোর খুন হয়েছে বলে পুলিশের তথ্য বলছে। এ ছাড়া আধিপত্য বিস্তার, পথচারীদের হঠাৎ ঘিরে ধরে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা-পয়সা কেড়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়া, রাস্তায় পরিকল্পিত সংঘাত তৈরির মাধ্যমে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চাঁদাবাজির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। তাদের বিরুদ্ধে নানা সময় মেয়েদের যৌন হয়রানি করারও অভিযোগ রয়েছে।

কামরাঙ্গীর চরের পূর্ব ও পশ্চিম রসুলপুরসহ আশপাশের এলাকাবাসী অতিষ্ঠ এই কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতে। অভিযোগ আছে, পারভেজ হোসেন ওরফে বিপ্লব কামরাঙ্গীর চর এলাকায় ‘ইয়ামিন’ ও ‘ফয়সাল’ নামের দুটি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে। তবে পারভেজ হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এলাকায় যারা আমাকে পছন্দ করে না, তারা এই অপবাদ ছড়াচ্ছে।’

এলাকাবাসী জানায়, পারভেজের দুটি গ্রুপ ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি গ্রুপ আছে এলাকায়। এর মধ্যে ১, ২ ও ৩ নম্বর গলি নিয়ন্ত্রণ করেন নাসির হোসেন ও তাঁর সহযোগী তুহিন (২২)। তাঁদের নিয়ন্ত্রণে কিংশোর গ্যাংয়ের ৭০ থেকে ৮০ জন সদস্য আছে। এদের আড্ডাস্থল মূলত পূর্ব রসুলপুর ১ নম্বর গলির মাথায়। এ ছাড়া পূর্ব রসুলপুরের ৫, ৬, ৭ ও ৮ নম্বর গলি সিরাজ তালুকদার এবং জাবেদ নিয়ন্ত্রণ করেন বলে এলাকাবাসী জানায়।

জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান লেফটেন্যান্ট কমান্ডার খন্দকার আল মঈন কালের কণ্ঠকে বলেন, বরাবরই কিশোর গ্যাং একটি বড় সমস্যা। গত কয়েক মাসে সারা দেশে র‌্যাবের অভিযানে শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করা হয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে তাঁরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন।

পুলিশ সূত্র বলছে, রাজধানীতে প্রতি মাসে হত্যার ঘটনা ঘটে গড়ে ২০টি। এর বেশির ভাগ ঘটনায় কিশোরদের সম্পৃক্ততা তদন্তে উঠে এসেছে। আবার ২০১৮ সাল থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে হওয়া ৩৬৩টি ছিনতাইয়ের নেপথ্যেও ছিল কিশোররা। প্রায় একই ছবি ঢাকার বাইরেও। কিশোর গ্যাংয়ের বড় উদাহরণ হয়ে আছে বরগুনার নয়ন বন্ড। ডাকাতি-ছিনতাই, মাদক কারবার ও সেবন, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানিসহ খুনখারাবিতে জড়িত কিশোর গ্যাংগুলো।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এর মধ্যে মিরপুর ও উত্তরায় সবচেয়ে বেশি। গ্যাং সদস্যদের মধ্যে অনেকে নামিদামি স্কুলের শিক্ষার্থী এবং ধনী ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তান রয়েছে। রাজধানীর কলাবাগানে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেদের নাম এসেছিল।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এই কিশোর অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ রাখছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সম্প্রতি বলেন, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দেবে যে তরুণ প্রজন্ম, সেই কিশোর-তরুণরা যেন পথ না হারায়, এ জন্য সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, কিশোররা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কিশোর অপরাধবিরোধী সামাজিক প্রচারণা কার্যক্রম ও র‌্যাব নির্মিত টিভিসির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি আরো বলেন, গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কিশোর সংশোধনাগারে স্থান সংকুলান হচ্ছে না।

তিন-চার বছর ধরে কিশোর গ্যাং আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অনেক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে জানিয়ে ওই অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, কিশোর আইন হালনাগাদ করা হয়েছে। কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ দরকার।

দেশে কিশোর গ্যাংয়ের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না জানিয়ে অনুষ্ঠানে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘গ্যাং কালচারের উৎপত্তি পশ্চিমা দেশগুলো থেকে। আমরা চাই, নষ্ট হয়ে যাওয়া কিশোরদের আঁধারের পথ থেকে আলোর পথে আনতে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বলছে, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তারা ২৩০ জনের একটি তালিকা করেছে। ওই তালিকা ধরে ওই কিশোরদের আইনের আওতায় আনতে বিশেষ পরিকল্পনা চলছে।

তবে আইনি এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি পারিবারিক অনুশাসন, সংস্কৃতিচর্চা ও খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়াউর রহমান বলেন, সামাজিক যে অনুশাসনগুলো ছিল সেগুলো সমাজে কাজ করছে না। যেমন সমাজের ভেতর পরিবার, প্রতিবেশী, এলাকাভিত্তিক সংস্কৃতিচর্চা, বন্ডিং—এগুলো নষ্ট হয়ে ছন্দঃপতন ঘটছে। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও খেলাধুলা একদমই নেই। এসব কারণে কিশোর-তরুণরা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করেন এই অপরাধ বিশ্লেষক। তিনি এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

সূত্র:কালেরকণ্ঠ

উত্তরা প্রতিদিন/ তৌফিকুল ইসলাম

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১২:২১ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০২ অক্টোবর ২০২১

uttaraprotidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

এনায়েত করিম সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)
প্রধান কার্যালয়

৫৩০ (২য় তলা), দড়িখরবোনা, উপশহর মোড়, রাজশাহী-৬২০২

ফোন: ০৭২১-৭৬০১৪৩, ০১৯৭৭১০০০২৭

E-mail: uttaraprotidin@gmail.com