বৃহস্পতিবার ২রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পদ্মার চরাঞ্চলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে শিশুরাই হচ্ছে শিশুর মা !

নুরুজ্জামান,বাঘা-রাজশাহী   |   রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ | প্রিন্ট

পদ্মার চরাঞ্চলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে শিশুরাই হচ্ছে শিশুর মা !

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার প্রত্যান্ত এলাকা পদ্মার চরাঞ্চলে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, দারিদ্রতা আর সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে বাড়ছে বাল্য বিয়ে। ফলে স্বাস্থ্য ঝুকি নিয়ে মা’হচ্ছে শিশুরা । উপজেলা সদর থেকে নদী বেয়ে অনেক দুরের একটি ইউনিয়ন হওয়ার কারনে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল না। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি সেখানে কম। আর এই সুযোগটিকে কাজে লাগাচ্ছে অনেক পিতা-মাতা।

পদ্মার কোলঘেঁষে সীমান্ত সংলগ্ন বাঘার বিস্তীর্ন চরাঞ্চল। এখানে শিক্ষার হার একে বারেই নিম্নগামী। প্রাইমারীর গন্ডি পেরুয় না অধিকাংশই কন্য শিশুর। প্রক্ষান্তরে ছেলে শিশুদেরও একই অবস্থা। এখানে বাল্যবিয়ে যেন কোন ব্যাপরই না। এখানকার অধিবাসীরা অশিক্ষা আর কুশিক্ষায় নিমজ্জিত। সরকারীভাবে ১৮ বছর বয়সের আগে মেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে কঠোর বিধিনিষেধ থাকলেও চারাঞ্চলে এগুলো মানা হয়না। তের -চোদ্দ বছরের বয়স হলেই এখানকার মেয়েদের বিয়ে দেয়া হয়। এরপর চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যেই তারা মা হয়। এর ফলে অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

সরেজিমন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চরাঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারে কম-বেশি বাল্য বিয়ের ঘটনা রয়েছে। প্রাইমারীর গন্ডি পেরিয়ে ষষ্ট কিংবা সপ্তম শ্রেনীতে উঠলেই মেয়েদের বিয়ে দেয়া হয়। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে প্রাইমারী গন্ডিও পেরুয় না। নানা কারণে এ অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে কুসংস্কার আঁকড়ে ধরে আছে।

চরাঞ্চলের নাজমুল ইসলাম নামে এক বাসিন্দা বলেন, মেয়ে বড় হলে বিয়ে দেয়ার সমস্যা । যেহেতু মেয়েকে বিয়ে দিতেই হবে , সেহেতু আগে দেয়াই ভালো।এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিবেচনা করে তো কেউ বিয়ে দেয়না। যুগ-যুগ ধরে এখানে এই অবস্থা চলে আসছে। তাই আমরাও করে আসছি।

চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক লাইলী বেগম ও মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলে বাল্য বিয়ের কারনে স্বাস্থ ঝুকি নিয়ে মা হওয়ার প্রবনতা আগের চেয়ে কিছুটা কমেছিল। করোনার কারনে দেড় বছর ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ঝরে গেছে। এ জন্য পিতা-মাতাকে একক ভাবে দায়ি করা যাবে না।কারণ অনেক শিক্ষার্থী প্রনয় ঘটিত কারনে একে অপরকে ভালবেসে ও বিয়ে করেছে।

এ বিষয়ে গাইনি চিকিৎসকরা বলেন, আঠারোর আগে শারিরীক মানসিক কোন দিক দিয়েই একটি মেয়ে বিয়ে এবং গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত হয় না। সন্তানধারণের জন্য শরীরের প্রস্তুতি প্রয়োজন। “পিউবার্টি বলি আমরা যে বয়সে প্রথম পিরিয়ড হবে-তার পরে আস্তে আস্তে তার বডিটা ডেভলপ করবে। এই ডেভলপমেন্টের জন্য একটা সময় দিতে হয়। পনের থেকে আঠার বছর পর্যন্ত এই শরীর গঠন চলতে থাকে। আঠারো বছরের আগে যদি মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয় তখন তার প্রপার গ্রোথ হয় না। এক্ষেত্রে গর্ভধারণ করলে প্রিম্যাচিওর ডেলিভারির শঙ্কা থাকে। যেটি শিশুর মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি করে।” তাঁদের মতে,বাল্য বিবাহ মেয়েদের স্বাস্থ্যে সমস্যার পাশা-পাশি শিশু মৃত্যুরও অন্যতম কারণ।

সার্বিক বিষয়ে বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা বলেন, একজন শিশুর পেট থেকে আরেকজন শিশুর জন্ম হবে এটা আমাদের কাম্য নয়। সরকারি ভাবে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে দিতে বারণ এটা জানেন-না এমন কোন মানুষ নেই। তার পরেও অতি গোপনে শুধু বাঘার চরাঞ্চল নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকাতে এর কম-বেশি প্রভাব রয়েছে। এ জন্য অশিক্ষা, কুশিক্ষা, দারিদ্রতা আর সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ অন্যতম বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন,এটি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা। তিনি এ বিষয়ে সুশীল সমাজ, জনপ্রতিনিধি, এলাকার অভিজ্ঞ মহল,ইমাম এবং শিকক্ষদের বাল্য বিয়ের কুফল সম্পর্কে বেশি-বেশি করে বক্তব্য উপস্থাপনের আহবান জানান।

উত্তরা প্রতিদিন/ তৌফিকুল ইসলাম

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

uttaraprotidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

এনায়েত করিম সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)
প্রধান কার্যালয়

৫৩০ (২য় তলা), দড়িখরবোনা, উপশহর মোড়, রাজশাহী-৬২০২

ফোন: ০৭২১-৭৬০১৪৩, ০১৯৭৭১০০০২৭

E-mail: uttaraprotidin@gmail.com