শনিবার ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ভারতের থানায় বাংলাদেশী দম্পতির বাস

বিদেশ ডেস্ক   |   মঙ্গলবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | প্রিন্ট

ভারতের থানায় বাংলাদেশী দম্পতির বাস

মোহাম্মদের বাড়ি খুলনায়। রিকশার পেডালে ঘুরত জীবনচাকা। স্ত্রী মাজিদা ও তিন সন্তানকে নিয়ে ছিল কষ্টের সংসার। এর মধ্যেই মোহাম্মদ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ভর্তি হন হাসপাতালে। একদিন তাঁর আয়ের একমাত্র সম্বল রিকশাটিও চুরি হয়ে যায়। এরপর মোহাম্মদ ও মাজিদাকে ভালো চাকরি পাইয়ে দেওয়ার টোপ ফেলে ভারতে পাচার করে দেয় একটি চক্র। সেখানে গিয়ে দুজনই ধরা পড়েন পুলিশের হাতে। জেল খাটার পর গেল ১৬ জুন তাঁরা কারাগার থেকে মুক্তি পান। বিচারক আদেশ দেন, যত দিন বাংলাদেশে ফেরা হচ্ছে না, তত দিন তাঁরা পুলিশের হেফাজতে থাকবেন। সেদিন থেকেই এই দম্পতির আবাস ভারতের পুনের ফরাসখান থানায়। গেল প্রায় তিন মাস তাঁরা সেখানে আছেন।

এদিকে মা-বাবার অনুপস্থিতিতে তাঁদের তিন সন্তান হয়ে পড়েছে অসহায়। বর্তমানে তারা ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন ধারণ করছে বলে তথ্য তুলে ধরেছেন বিবিসির এক সাংবাদিক। গত ৫ আগস্ট বিবিসিতে ‘ভারতে বাংলাদেশি নারী দুই বছর জেল খাটার পর স্বামীসহ দিন কাটাচ্ছেন থানায়’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে।

এ ব্যাপারে তথ্য খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, মুক্তি পেয়ে থানায় যাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁদের ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। কালের কণ্ঠর তরফ থেকে মানবপাচার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘রাইটস যশোর’-এর সহযোগিতা চাওয়া হয়। রাইটস যশোরের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক এস এম আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই দুজনের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি। তাঁরা বর্তমানে ফরাসখান থানায় আছেন বলে জানতে পেরেছি। তাঁদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আমরাও কাজ করছি। আশা করছি, শিগগিরই ফিরিয়ে আনা যাবে।’ তিনি বলেন, ‘আগামী ২০ সেপ্টেম্বর পাচার হওয়া ২০ জনকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া প্রায় শেষের দিকে। ওই গ্রুপে তাঁরাও থাকতে পারেন।’

বিবিসির সংবাদে বলা হয়, মোহাম্মদ ও মাজিদার ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালে। দরিদ্র এই দম্পতির মাথার ওপর ছিল ঋণের বোঝা। সড়ক দুর্ঘটনার পর তাঁরা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। মোহাম্মদের এক বন্ধু কাজ দেওয়ার টোপ দিয়ে তাঁকে ভারতে যেতে অনুরোধ করেন। ওই বন্ধু তাঁকে বাংলাদেশেই একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন, যিনি তাঁদের ভারতে নিয়ে যান। পরে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আরেকজনের হাতে তুলে দেন। সেই ব্যক্তিই ট্রেনে করে তাঁদের পুনেতে নিয়ে যান।

তাঁদের দুজনকে (মোহাম্মদ ও মাজিদা) পুনের বুধওয়ার এলাকায় নেওয়া হয়, কিন্তু হঠাৎ এক পুলিশি অভিযানে আটক হন মোহাম্মদ। মাজিদাকে পাচারকারীরা একটি কক্ষে আটকে রেখেছিল। তাঁকে বলা হয় যে তিনি যদি তাঁর স্বামীকে জেল থেকে মুক্ত করতে চান, তাহলে তাঁকে অনৈতিক কাজে জড়িত হতে হবে, কিন্তু এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাঁকে কয়েক দিন ওই কক্ষে আটক রাখা হয়। ওই সময় তিনি পাশের একটি পুলিশ স্টেশনের কথা জানতে পারেন। পরে এক বাঙালি নারীর সহায়তায় তিনি সেখানে যান এবং পুরো ঘটনা খুলে বলেন। যেহেতু এই দম্পতি ভারতে অবৈধভাবে এসেছেন, সে কারণে পুলিশ মাজিদাকে আটক করে। আদালতে দুজনই দোষ স্বীকার করেন এবং তাঁদের দুই বছর তিন মাস করে জেল হয়। এই সাজার মেয়াদ শেষ হয় গত ১৬ জুন। আদালত তাঁদের কাগজপত্র সংগ্রহ করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো পর্যন্ত ফরাসখানা থানা হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। ফলে ওই সময় থেকে মাজিদা ও মোহাম্মদ ফরাসখানা থানার হেফাজতেই আছেন।

ওই থানার সিনিয়র পুলিশ ইন্সপেক্টর রাজেন্দ্র লান্দাগে বিবিসি মারাঠি সার্ভিসকে বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ মতো ওই দম্পতি থানা ভবন ছাড়তে পারবেন না। তাঁরা যে বাংলাদেশি তেমন সব প্রমাণ আমরা আদালতে দিয়েছি। এগুলো বাংলাদেশ দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে। এখানে আমাদের পুলিশ সদস্যরা তাঁদের থাকা-খাওয়াসহ সব সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।’

মাজিদা বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের এখন যাওয়ার কোনো উপায় নেই। আমার বাচ্চারা কাঁদছে। প্রতিনিয়ত জানতে চাইছে যে আমরা কবে ফিরব। কেন আমরা এত দিন এখানে। বাংলাদেশ সরকার অনুমতি দিলেই তারা আমাদের ছেড়ে দেবে। বাড়িতে খাবার নেই। আমার ছেলে-মেয়েরা না খেয়ে ঘুমাতে যেতে হচ্ছে।’

বাড়ির কথা মনে করে মোহাম্মদেরও চোখে পানি। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের ঘরের অবস্থা ভালো নয়। ভিক্ষা করে চলে এখন পুরো পরিবার। আমি ছিলাম একমাত্র অবলম্বন। তিন সন্তান আমার ও তাদের মায়ের ফেরার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা দেড় মাস ধরে (৫ আগস্ট পর্যন্ত) এখানে আছি। ভারত সরকারের সঙ্গে সব কাগজপত্র নিয়ে কাজ শেষ। জানি না বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে কী হলো। জানি না আমাদের ছাড়া আর কত দিন পরিবার বাঁচবে।’

সূত্র: কালেরকণ্ঠ

উত্তরা প্রতিদিন/ তৌফিকুল ইসলাম

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১২:১৩ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

uttaraprotidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
আব্দুল্লাহ্ আল মাহমুদ বাবলু সম্পাদক
এনায়েত করিম প্রধান বার্তা সম্পাদক
প্রধান কার্যালয়

৫৩০ (২য় তলা), দড়িখরবোনা, উপশহর মোড়, রাজশাহী-৬২০২

ফোন: ০৭২১-৭৬০১৪৩, ০১৯৭৭১০০০২৭

E-mail: uttaraprotidin@gmail.com