বৃহস্পতিবার ২রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

রংপুর অঞ্চলের বদ্ধভূমি নিয়ে নির্মিত হচ্ছে পরিবেশ থিয়েটার

উত্তরা ডেস্ক   |   বৃহস্পতিবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | প্রিন্ট

রংপুর অঞ্চলের বদ্ধভূমি নিয়ে নির্মিত হচ্ছে পরিবেশ থিয়েটার

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দেশের ৬৪ জেলার বদ্ধভূমি নিয়ে পরিবেশ থিয়েটার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে রংপুর জেলার নিশবেতগঞ্জে ‘রক্ত গৌরব’ বদ্ধভূমি নিয়ে নির্মিত হচ্ছে পরিবেশ থিয়েটার।

একাত্তরের ৩ মার্চ। মিছিল আর শ্লোগানে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছিল গোটা রংপুর। প্রতিবাদমুখর মানুষের মিছিলে নির্বিচারে চালানো হয় গুলি। শহীদ হন কিশোর শংকুসহ আরও ৩ জন। রংপুর অঞ্চলে তারাই স্বাধীনতার প্রথম শহীদ। তাদের রক্তদানের মাধ্যমে উত্তাল হয়ে ওঠে রংপুর। স্বাধীনতাকামী মানুষ সংগঠিত হতে থাকে। প্রস্তুতি গ্রহণ করে সশস্ত্র সংগ্রামের। এরই অংশ হিসেবে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে স্বাধীনতাকামী মানুষ। দিনক্ষণ ঠিক হয় ২৮ মার্চ। ঘেরাও অভিযানে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রংপুরের বিভিন্ন হাটে-বাজারে ঢোল পিটানো হয়। আর এ আহ্বানে অর্ভূতপূর্ব সাড়া মেলে। সাজ সাজ রব পড়ে যায় চারিদিকে। যার যা আছে তাই নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নেয় এ অঞ্চলের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ছাত্র, কৃষক, দিনমজুরসহ সকল পেশার সংগ্রামী মানুষ। রংপুরের আদিবাসীরাও তীর-ধনুক নিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এক্ষেত্রে মিঠাপুকুর উপজেলার ওরাঁও সম্প্রদায়ের তীরন্দাজ সাঁওতালদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তীর-ধনুক, বল্লম, দা, বর্শা নিয়ে তারা যোগ দিয়েছিলেন ঘেরাও অভিযানে।

ঐতিহাসিক ২৮ মার্চ রংপুরবাসীর কাছে অবিস্মরণীয় দিন। ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাত্র একদিন পরই রংপুরবাসী ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল সে পথ ধরেই সূচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রাম। স্বাধীনতাপ্রিয় প্রতিবাদী রংপুরবাসী ‘৭১ এর এই দিনে লাঠি-সোঠা, তীর-ধনুক নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে জন্ম দিয়েছিল এক অনন্য ইতিহাসের।

সকাল থেকে রংপুরের বিভিন্ন এলাকার মানুষ সংগঠিত হতে থাকে। সময় যত এগিয়ে আসে উত্তাপ আর উত্তেজনা যেন ততই বাড়তে থাকে। সকাল ১১টা বাজতে না বাজতেই সাজ সাজ রব পড়ে যায় চারিদিকে। জেলার মিঠাপুকুর, বলদীপুকুর, মানজাই, রানীপুকুর, তামপাট, পালিচড়া, বুড়িরহাট, গঙ্গাচড়া, শ্যামপুর, দমদমা, লালবাগ, গনেশপুর, দামোদরপুর, পাগলাপীর, সাহেবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হতে থাকে। সবার হাতে ছিল লাঠি-সোটা, তীর-ধনুক, বর্শা, বল্লম, দা ও কুড়াল।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং সে সময় রংপুর ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ২৯ ক্যাভেলরি রেজিমেন্টের মেজর নাসির উদ্দিন তার ‘যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা’ গ্রন্থে সে দিনের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন, যে দৃশ্য আমি দেখলাম তা চমকে যাবার মতোই। দক্ষিণ দিক থেকে হাজার হাজার মানুষ সারি বেঁধে এগিয়ে আসছে সেনা ছাউনির দিকে। তাদের প্রত্যেকের হাতেই দা-কাঁচি, তীর-ধনুক, বর্শা, বল্লমের মতো অতি সাধারণ সব অস্ত্র। বেশ বোঝা যাচ্ছিল এরা সবাই স্থানীয়। সারি বাঁধা মানুষ পিপঁড়ের মতো ক্রমেই এগিয়ে আসছে ক্যান্টনমেন্টের দিকে। এ সময় ক্যান্টনমেন্ট থেকে গোটা দশেক জিপ বেড়িয়ে আসে এবং মিছিল লক্ষ্য করে শুরু হয় একটানা মেশিনগানের গুলিবর্ষণ। মাত্র ৫ মিনিটে চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার লাশ পরে থাকে মাঠে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাঠের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে টেনে হিঁচড়ে এনে এক জায়গায় জড়ো করা হলো পুড়িয়ে ফেলার জন্য। কিন্তু তখনো যারা বেঁচে ছিলেন তাদের গোঙানিতে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল পাঞ্জাবী জান্তারা। এ অবস্থাকে আয়ত্তে আনার জন্যে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে চিরতরে তাদের থামিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো তারা। আহতদের আর্তনাদে গোটা এলাকার আকাশ বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠলো। তার বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, ‘সেদিন সন্ধ্যার আগেই নির্দেশ মতো ৫০০ থেকে ৬০০ মৃতদেহ পেট্রল ঢেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো আগুন। এ আগুন অন্য যেকোনো আগুনের চেয়ে অনেক বেশি লাল। অনেক বেশি দহন করে এই বহিঃশিখা। আমি খুব কাছ থেকেই আগুন দেখছি কেমন করে জ্বলছে স্বাধীনতাপ্রিয় অসহায় মানব সন্তান।’

২৮ মার্চ রংপুরের মানুষ জেগে উঠেছিল এক নবচেতনায়। স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ মানুষ রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চল হতে লাঠিসোটা, তীর ধনুক, বল্লম নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাঁশের লাঠি আর তীর-ধনুক নিয়ে পাকিস্তানি হায়েনাদের আবাসস্থল ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের ঘটনা ইতিহাসে বিরল। এমনি এক ঘটনাই সেদিন ঘটিয়েছিলেন রংপুরের বীর জনতা।

স্বাধীনতাকামী রংপুরের মানুষ ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের মধ্য দিয়ে শুরু করেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ। ২৮ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ তথা পাক হানাদার বাহিনীর সাথে এটাই তাদের মুখোমুখি প্রথম যুদ্ধ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেদিনের সেই ত্যাগের স্বীকৃতি জাতীয়ভাবে আজও মেলেনি। তবে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও অভিযানে যেখানে আত্মত্যাগী মানুষগুলো শেষবারের মত একত্রিত হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক নিসবেতগঞ্জ এলকায় ২০০৩ সালে ‘রক্ত গৌরব’ নামে নির্মিত হয় একটি স্মৃতিস্তম্ভ যা আজও নিরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রতিবছর এই দিনে স্থানীয় জনগণের উদ্যোগে নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে পালিত হয় ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস।

রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের সেই অনন্য ইতিহাসকে ঘিরে সুমিত মোহন্তের রচনা ও রাজ্জাক মুরাদের নির্দেশনায় ‘রক্ত গৌরব’ বদ্ধভূমি নিয়ে নির্মিত হচ্ছে পরিবেশ থিয়েটার। এ লক্ষ্যে গতকাল বুধবার রংপুরের সকল নাট্যকর্মীদের নিয়ে জেলা শিল্পকলা একাডেমির হলরুমে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার নুঝাত তাবাসসুম রিমু। ১০টি নাট্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সভায় বক্তব্য রাখেন। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেন নাটকের নির্দেশক রাজ্জাক মুরাদ। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর শিল্পী বাছাইয়ের জন্য সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হবে। রংপুরের বিপুলসংখ্যক অভিনয় শিল্পী মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র: কালেরকণ্ঠ

উত্তরা প্রতিদিন/ তৌফিকুল ইসলাম

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১২:৪০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

uttaraprotidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

এনায়েত করিম সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)
প্রধান কার্যালয়

৫৩০ (২য় তলা), দড়িখরবোনা, উপশহর মোড়, রাজশাহী-৬২০২

ফোন: ০৭২১-৭৬০১৪৩, ০১৯৭৭১০০০২৭

E-mail: uttaraprotidin@gmail.com