বৃহস্পতিবার ২রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

দেশে ফেরার কথা কী ভুলে গেছে রোহিঙ্গারা ?

উত্তরা ডেস্ক   |   বুধবার, ২৫ আগস্ট ২০২১ | প্রিন্ট

দেশে ফেরার কথা কী ভুলে গেছে রোহিঙ্গারা ?

রোহিঙ্গা ঢলের চার বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ ২৫ আগস্ট। ২০১৭ সালের এই দিনের পাশের দেশ মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে সহিংসতার জের ধরে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ঠাঁই হয়েছিল কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ে। নতুন ঢলে আসা ও পূর্বে কয়েক দফায় আসা রোহিঙ্গা মিলে উখিয়া-টেকনাফে এখন প্রায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। রোহিঙ্গা আগমনের গত চার বছরে দুই দফা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর। কিন্তু ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর ও ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর সব প্রস্তুতি শেষ করেও রোহিঙ্গাদের আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হয়।

 

বাংলাদেশে প্রথম ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গারা শরণার্থী হয়ে আসে। এসময় মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দোহাই দিয়ে আসা প্রায় সাড়ে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজার ও বান্দরবন জেলায় আশ্রয় নেয়। ওই সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় বা ভরণপোষনে আন্তর্জাতিক কোন সাহায্য সহযোগিতা ছিল না। পরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সিদ্ধান্ত মতে মিয়ানমার সরকার দুই লাখ রেহিঙ্গাকে ফেরত নেয়। ওই সময়ে থেকে যাওয়া প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা পরবর্তীতে বিভিন্ন উপায়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে নাগরিকত্ব নিয়ে নেয়।

 

১৯৯২ সালে মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতায় রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন চালালে সে বছর আড়াই লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়। ২০১২ সাল ও ২০১৬ সালেও বাংলাদেশে প্রায় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখের বেশি। ২০১৭ সালের আগস্টে বাংলাদেশে ঢুকেছিল সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। সবমিলিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ লাখের অধিক। সেখানে সাড়ে এগার লাখ রোহিঙ্গার বসবাস উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪ টি ক্যাম্পে। বাকিরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তবে ক্যাম্পের বাইরে থাকা রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভোটার তালিকায় নাম উঠিয়ে নিজেরা বাংলাদেশী নাগরিক পরিচয় দিচ্ছেন।

 

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের কবে দেশে ফেরত পাঠানো হবে এ নিয়ে উদ্বিগ্ন রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা। দুই দফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার পর এখন আর রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত পাঠানোর কোন উদ্যোগই নেই। এরই মাঝে রোহিঙ্গারাও স্বদেশে ফেরার কথা অনেকটা ভুলে গেছেন। ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশির ভাগ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশেই থেকে যেতে চায়। কেউকেউ আবার শর্ত মানলে খুশিতে মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজি। তবে মিয়ানমার ফিরে যেতে রোহিঙ্গাদের প্রধান শর্ত তাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দেয়া।

 

টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নারী ছমুদা বেগম বলেন, মিয়ানমার ফিরে গেলে আমাদের কষ্টে দিনযাপন করতে হবে। সেখানে আমাদের আয় রোজগারের সুযোগ থাকবে না। এখানে আমরা ঘরে বসে খাবার, চিকিৎসা সবই পাচ্ছি। আমাদের এই আরাম আয়েশের জীবন ছেড়ে কেন আবার মিয়ানমার ফেরত পাঠানোর কথা উঠছে বুঝছি না।

উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা যুবক আলী আহমদ বলেন, মিয়ানমার সরকার সহজে আমাদের মেনে নেবে না। আমাদের নাগরিকত্ব ও ভিটেমাটি ফেরত দেবে না। সেখানে আবারো আমাদের শরণার্থী হয়ে পাঠানো আমাদের জন্য হুমকি হবে।

একই উপজেলার কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ আলম বলেন, মিয়ানমার সরকার এখনো রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার পরিবেশ তৈরী করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। প্রত্যাবাসনের নামে আমাদের আবারো ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিলে সেটা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য হতাশাজনক হবে।

উখিয়া ও টেকনাফের দুই উপজেলায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশির ভাগ রোহিঙ্গা স্বদেশে ফেরত যেতে অনাগ্রহী। তাদের কেউ কেউ মিয়ানমারে ফেরত যেতে হবে এ কথা যেন ভুলেই গেছেন। তাদের ভরসা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে রাখতে সাধ্যমতে চেষ্টা করবে এবং তাদের পাশে থাকবে। তবে এত বিপুল রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যেতে চায় এমন রোহিঙ্গারও দেখা মিলে কোন কোন ক্যাম্পে। কিন্তু বেশির ভাগ রোহিঙ্গা মিয়ানমার ফেরার বিরোধী হওয়ায় যারা ফিরতে আগ্রহী তারা মুখ খুলতে পারে না অন্যদের ভয়ে।

উখিয়ার থাইংখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বয়োবৃদ্ধ রোহিঙ্গা আজম উল্লাহ বলেন, আমার জন্মস্থান মিয়ানমার, বাপ দাদার কবর সেখানে। শরণার্থী জীবন আর ভালো লাগছে না। নিজ দেশে ফিরতে মন চাইছে। জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটা জন্মভূমিতে ত্যাগ করতে চাই, সেখানে মরতে চাই। যত দ্রুত ফিরতে পারি ততই আমাদের জন্য এবং রোাহিঙ্গা জনগোষ্টির জন্য কল্যানজনক। সেটি অনেক রোহিঙ্গা বুঝে না।

এদিকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফেরত পাঠানোর কোন তড়িৎ উদ্যোগ না থাকায় বাংলাদেশিদের মধ্যে দিনদিন ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। তাদের মতে রোহিঙ্গাদের বসবাসের কারণে বিশেষ করে কক্সবাজারে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। রোহিঙ্গারা দিনদিন সহিংস, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। হত্যা, অপহরণ, ডাকাতি, ধর্ষণ, মাদক পাচার থেকে শুরু করে এমন কোন অপরাধ নেই যা রোহিঙ্গারা করছেন না।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয় জানায়, প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মিয়ানমারের কাছে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত পাঁচ ধাপে মোট ৫ লাখ ৯৭ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে সে-বছরের শুরুতে একসঙ্গে ৪ লাখ ৯২ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা দেওয়া হয়েছে। এসব তালিকা থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ১১ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফেরত নেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু তাও এখন পর্যন্ত ফেরত নেয়নি।

এ প্রসঙ্গে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) শাহ রেজওয়ান হায়াত জানান, “রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হচ্ছে আমাদের শেষ লক্ষ্য। তখনই চুড়ান্ত সাফল্য আসবে, যখন তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। তবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি চলমান, বিষয়টি পরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় দেখছেন। সব ঠিকঠাক করে যখন আমাকে দিন ধার্য্য করে দিবেন, তখনই সকল লজিস্টক দিয়ে রোহিঙ্গাদের পাঠানোর দায়িত্ব আমার।”

সূত্র: কালের কণ্ঠ

উত্তরা প্রতিদিন/ তৌফিকুল ইসলাম

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১:১২ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৫ আগস্ট ২০২১

uttaraprotidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
এনায়েত করিম সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)
প্রধান কার্যালয়

৫৩০ (২য় তলা), দড়িখরবোনা, উপশহর মোড়, রাজশাহী-৬২০২

ফোন: ০৭২১-৭৬০১৪৩, ০১৯৭৭১০০০২৭

E-mail: uttaraprotidin@gmail.com