শনিবার ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

রহনপুরের রহিম-অলি’র গল্প 

গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিবেদক   |   রবিবার, ০১ আগস্ট ২০২১ | প্রিন্ট

রহনপুরের রহিম-অলি’র গল্প 

মাইক্রোসেফালীতে আক্রান্ত দুই ভাই রহিম ও অলি

জন্মের পর হতেই মাইক্রোসেফালীতে আক্রান্ত দুই ভাই। মাইক্রোসেফালীর (মগজ কম) কারণে তাদের নেই কোন কর্মক্ষমতা। কষ্ট করে হাঁটাচলা করতে পারলেও বলতে পারে না কথা, এমনকি খেতেও পারে না নিজ হাতে। মগজ কম হওয়ার কারণে ছোট মাথার অদ্ভূত আকৃতি দুই ভাইয়ের। শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্যহীনতা এবং দৈহিক গঠনের জন্য সকলের কাছে অবহেলা-উপহাসের পাত্র দুই ভাই মো. রহিম (৪০) ও মো. অলি (৩৫)।
অসহায় এই দুই সহোদরদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর পৌরসভার বাগানপাড়া মহল্লায়। মৃত ফানসুর আলী ও মোসা. তাহমিনা বেগমের ছেলে তারা। সকালে ঘুম হতে উঠা থেকে রাতের ঘুম যাওয়া পর্যন্ত দিন-রাতের সব সময় তাদের সবকিছুই করে দিতে হয় মা তাহমিনা বেগমকে। এমনকি মা একটু চোখের আড়ালে গেলেই বাইরে চলে যায় রহিম-অলি। তাই তাহমিনা বেগম বাড়ি থেকে বের হলে একজনকে ঘরের মধ্যে আটকে ও আরেকজনকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে যান।

একদিকে গত ৪ দশক ধরে দুই ছেলের এ অবস্থা, অন্যদিকে দারিদ্রতা। ৮ সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রহিম-অলির বড় ভাই শাহাদাত হোসেন তোতা। ছোট্ট এক মুদি দোকান চালিয়ে প্রতিবন্ধী দুই ভাইকে আগলে রেখেছেন। স্বামী মারা যাবার পর নিজেই দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে বড় করেছেন অসুস্থ রহিম-অলিসহ তিন ছেলে ও এক মেয়েকে। গত ৪০ বছর ধরে দুই ছেলেকে চোখে চোখে রেখেছেন তাহমিনা বেগম। তিনি জানেন, তার চোখেই দুনিয়া দেখে দুই ছেলে, তার পা দিয়েই হেঁটে চলে রহিম-অলি।

সকলের কাছে গত ৪ দশকের এই কষ্ট, অবহেলা ও তাচ্ছিল্যের হলেও তাহমিনা বেগম নিজেকে ভাগ্যবান ও সুখী মনে করেন। তিনি বলেন, সবসময় একটা চিন্তায় থাকি, আমার তো বয়স হয়েছে। আমি না থাকলে তাদের কি হবে? কারণ তারা কারো কাছে থাকে না, কারো হাতে খায় না। দুই ভাইয়ের একজন তো মাকে ছাড়া ঘুমোতেই পারে না। তাদের জন্য এই চিন্তাই রাতে ঘুমও আসে না।

তাহমিনা বেগম আরও বলেন, জন্মের পর থেকেই তাদের মাথার আকৃতি ছোট ছিল। এরপর স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা জানান, আমার ছেলেদের মাথায় মগজ কম। তারা আরও বলেন, এর নাকি চিকিৎসাও নেই। এরপর থেকে তাদেরকে নিয়েই এভাবে চলে যাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠে প্রসাব-পায়খানা করানো, হাত-মুখ ধুয়ে দেয়া দিয়ে দিনের শুরু হয়। এরপর মুখে খাবার তুলে দেয়া, জামা-কাপড় পরানো, গোসল করানো সবকিছুই আমি করে দেই। এককথায় তারা কিছুই করতে পারে না। প্রতিবেশীদের বাড়িতে গেলে তারাও তাড়িয়ে দেয় বা আমাকে খবর দিলে দৌড় দিয়ে উপস্থিত হয়ে বাড়িতে নিয়ে আসি।

প্রতিবেশী শুকুরউদ্দিন বলেন, জন্মের পর থেকেই দেখছি তারা এমন। একেবারেই অক্ষম, কিছুই করতে পারে না। খুব কষ্টে তাদের দিন যায়। বড় ভাই তাদেরকে নিয়ে দোকানদারি করে সংসার চালায়। শত কষ্ট করেও খেয়ে, না খেয়ে দিন যাপন করছে তারা। সরকার এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ালে তাদের জন্য ভালো হতা।
তাহমিনা বেগমের বড় ছেলে মুদি দোকানী শাহাদাত হোসেন তোতা বলেন, আমার আয় খুবই সামান্য হলেও মা-ভাইদের নিয়ে একসাথে থাকতে পারাটাই আমার কাছে আনন্দের। প্রতিবন্ধী হিসেবে দুনিয়ায় এসেছে, কিন্তু তারাও তো একই সৃষ্টিকর্তার তৈরি। পারিবারিক আর্থিক অনটনে থাকার সময় সাময়িক মন খারাপ হলেও ভাইদের কখনো বোঝা মনে করেন না বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজ জানান, মাইক্রোসেফালীতে আক্রান্ত ২ ভাই স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারবে না । কারণ তাদের সে ক্ষমতাই নেই। মহান আল্লাহ তাদের এভাবেই সৃষ্টি করেছেন।

রহনপুর পৌর মেয়র মতিউর রহমান খাঁন বলেন, একজন মানুষ হিসেবে তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই। সকলেরই উচিত নিজেদের জায়গা থেকে তাদেরকে সহায়তা করা। পৌরসভা ও আমি ব্যক্তিগতভাবে এই পরিবারটির জন্য একটি স্থায়ী উপার্জনের ব্যবস্থা করতে চাই। যা খুব শীগ্রই করা হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, বিত্তবান, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সকলের প্রতি পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান মোবাইলে ফোনে জানান, দুই ভাইকে প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেয়া হয়েছে। এমনকি আমি নিজেই তাদের বাসায় উপস্থিত হয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে দুটি ঘর নির্মাণ করে দিতে চেয়েছি। ঘর নির্মাণ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়াও তাদের বড় ভাইয়ের দোকানের পরিধি বাড়াতে ৩০ হাজার টাকা সহায়তা করা হয়েছে।

উত্তরা প্রতিদিন/ আমিনুল

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৯:২১ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০১ আগস্ট ২০২১

uttaraprotidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
আব্দুল্লাহ্ আল মাহমুদ বাবলু সম্পাদক
এনায়েত করিম প্রধান বার্তা সম্পাদক
প্রধান কার্যালয়

৫৩০ (২য় তলা), দড়িখরবোনা, উপশহর মোড়, রাজশাহী-৬২০২

ফোন: ০৭২১-৭৬০১৪৩, ০১৯৭৭১০০০২৭

E-mail: uttaraprotidin@gmail.com