রবিবার ১৭ই অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১লা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতি দমনে গণশুনানি 

ইমদাদ ইসলাম, পিআইডি ফিচার   |   মঙ্গলবার, ২৯ জুন ২০২১ | প্রিন্ট

জাতিসংঘের উদ্যোগে সকল মানুষের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে একটি অধিকতর টেকসই ও সুন্দর বিশ্ব গড়ার প্রত্যয় নিয়ে সার্বজনীনভাবে একগুচ্ছ সমন্বিত কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। এতে ১৭টি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ও ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ অভীষ্টের ১৬.৫ ক্রমিকে “সব ধরনের দুর্নীতি ও ঘুষ পর্যপ্ত পরিমাণে হ্রাস করা”- এর কথা উল্লেখ রয়েছে। এ অভীষ্টটি বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের। আর সহযোগী মন্ত্রণালয় হিসেবে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সাথে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়েরও ভুমিকা রয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত তথ্য অধিদফতর দুর্নীতির বিষয়ে জনগণকে সচেতন ও বিভিন্ন তথ্য সম্পর্কে অবহিত করার লক্ষ্যে নিয়মিত সংবাদ, ফিচার ও কার্টুন প্রকাশ ও প্রচার করে থাকে। সময়ের সাথে সাথে দুর্নীতি বা নীতিবোধের বিষয়গুলো পরিবর্তিত হয়। একই সাথে গণমাধ্যমের কাছেও এর সংবাদ মূল্য পরিবর্তিত হয়। দুর্নীতিকে দমনের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন নানা রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং করছে। কখনো একটি নির্দিষ্ট কৌশল দিয়ে অথবা শুধু মাত্র আইন দিয়ে দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য সময়ের সাথে সাথে কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশন দেশের দুর্নীতি দমনের জন্য নানা রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। এরমধ্যে জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে গণশুনানির আয়োজন করে থাকে। গণশুনানির মাধ্যমে সরকারি দপ্তর ভিত্তিক পরিসেবার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দপ্তরের দুর্বলতা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। গণশুনানি মূলত একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক। এখানে সবশ্রেণির সম্মানীত নাগরিক, সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের ঊর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন।

এ সকল সভায় উপস্থিত বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার নাগরিকগণ তাদের অভিযোগ ও সমস্যার বিষয়গুলো উপস্থাপন করেন। সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা সে বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেন এবং তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অধিকাংশ সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান ও পাওয়া যায়। গণশুনানি স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি বিরোধী গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কমিশন ২০১৪ সালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় প্রথম গণশুনানি শুরু করে। প্রতিটি জেলায় নিয়মিতভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে গণশুনানির আয়োজন করা হয়ে থাকে। করোনা মহামারি কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন তাদের সচেতনতা মূলক কৌশলে পরিবর্তন এনেছে।

গণশুনানির কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে। সেবা প্রত্যাশী নাগরিকদের অভিযোগ সরাসরি শুনে সেগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর কর্তৃক বিধি মোতাবেক নিষ্পত্তি করা। নাগরিক সনদের (সিটিজেন চার্টার) ভিত্তিতে জনগণকে সেবা প্রদান নিশ্চিত করা এবং সেবার মান উন্নত করা। নাগরিক অধিকার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা ও সংশ্লিষ্ট অফিসের সেবা প্রদানে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণ চিহ্নিত করা এবং ক্ষেত্র বিশেষে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

গণশুনানির মাধ্যমে অনেক সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হচ্ছে। এছাড়াও দুর্নীতি ও অনিয়মের উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অফিসের দুর্নীতি ও অনিয়মের ব্যাপকতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সেবা সম্পর্কে জনগণ কতটুকু সচেতন সে সে বিষয়েও ধারণা পাওয়া যায়। সামগ্রিক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে দুর্নীতি দমনের কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। এতে করে দুর্নীতি ও অনিয়ম দৃশ্যমান ভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। গণশুনানির আইনগত ভিত্তি রয়েছে। আমাদের সংবিধানের ২০(২),২১(২) অনুচ্ছেদ এবং দুর্নীতি দমন আইন ২০০৪, তথ্য অধিকার আইন ২০০৯, সরকার অনুমোদিত জাতীয় শুদ্ধচার কৌশল, ২০১২ এর ভিত্তিতে গণশুনানি করা হয়ে থাকে।

-২-
প্রতিটি গণশুনানিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সরকারি সেবাগ্রহীতা নাগরিকগণ, সরকারি কর্মকর্তা- কর্মচারী, মিডিয়া ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, আইনজীবী, এনজিও প্রতিনিধি এবং অন্যান্য আগ্রহী ব্যক্তিবর্গসহ সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকে। এছাড়াও স্থানীয় মাননীয় সংসদ সদস্য, মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট সকল জনপ্রতিনিধিদের গণশুনানিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়ে থাকে।

গণশুনানির মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে দুরত্ব কমিয়ে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করা হয়। এ ছাড়াও সরকারি পরিসেবা ও নিয়ম কানুন সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা, সেবা প্রদান পদ্ধতির উন্নয়ন, কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা সম্ভব হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন জেলার উপজেলা ভূমি অফিস, উপজেলা পরিষদ, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, হিসাব রক্ষণ অফিস, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, সমবায় ও সমাজ সেবা অফিস, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অফিস অন্যতম।

এছাড়াও যে সকল দপ্তরের বিরুদ্ধে সচারাচর মানুষ অভিযোগ করে থেকে সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ঐ সকল অফিসেও গণশুনানির আয়োজন করে থাকে। গণশুনানির মাধ্যমে প্রাপ্ত যে সকল অভিযোগ তাৎক্ষণিক ভাবে মিমাংসা করা সম্ভব হয় না, সেগুলো মিমাংসার জন্য দুদকের পক্ষ থেকে দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়ে থাকে। এ নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা দুদকের পক্ষ থেকে নিয়মিত ভাবে ফলোআপ করা হয়।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের জেলা তথ্য আফিস সমূহ এসকল গণশুনানিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে তাদের চাহিদা মোতাবেক সকল প্রকার প্রচার কার্যসহ সহায়তা করে থাকে। এছাড়াও জেলা তথ্য অফিস সমূহ দুর্নীতি বিরোধী গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্য দুর্নীতি দমন কমিশনের চাহিদা মোতাবেক সারা বছরই বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

সরকার ইতিমধ্যে অনেক সেবা ডিজিটাল মাধ্যমে সরাসরি সেবাগ্রহীতার নিকট পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। ইতিমধ্যে সরকারের বিভিন্ন প্রকার ভাতা সমূহ সরাসরি জি টু পি এর মাধ্যমে সেবা গ্রহীতাকে পৌঁছে দিয়েছে। এতে করে দুর্নীতি কমেছে। “হাতের মুঠোয় ভূমি সেবা” প্রদানের মাধ্যমে ভূমি অফিসগুলো ডিজিটাল সেবার আওতায় এসেছে। এর মাধ্যমে ভূমি অফিস সম্পর্কে মানুষের দীর্ঘদিন দিন প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।
মাননীয় অর্থ মন্ত্রী তার ২০২১-২২ সলের বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করছেন দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কমিশনের সামগ্রিক কার্যক্রমকে অটোমেশন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়াও সরকারের দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয় উল্লেখ করেছেন। সরকারে দুর্নীতি বিরোধী কঠোর অবস্থান, সরকারি সেবা প্রদানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং জনগণকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে দুর্নীতিকে এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কমিয়ে এনে ২০৪১ এর মধ্যে সরকার বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এলক্ষ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকলের চেষ্টার মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

 

উত্তরা প্রতিদিন/শাহ্জাদা মিলন

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১১:০০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৯ জুন ২০২১

uttaraprotidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
এনায়েত করিম সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)
প্রধান কার্যালয়

৫৩০ (২য় তলা), দড়িখরবোনা, উপশহর মোড়, রাজশাহী-৬২০২

ফোন: ০৭২১-৭৬০১৪৩, ০১৯৭৭১০০০২৭

E-mail: uttaraprotidin@gmail.com