শুক্রবার ৩০শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

বাংলাদেশের উন্নয়নশীল অগ্রযাত্রা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পদক্ষেপ

মো. সিকান্দার আবু জাফর, সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রাজশাহী   |   সোমবার, ২৮ জুন ২০২১ | প্রিন্ট

বাংলাদেশের উন্নয়নশীল অগ্রযাত্রা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পদক্ষেপ

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির অহংকার মহান মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেয়া অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর পৃথিবীর মানচিত্রে ঠাঁই পাওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ সম্পর্কে পৃথিবীর খ্যাতনামা রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, অর্থনীতিবিদগণ বিরূপ মন্তব্য করতে পিছপা হলেন না।

অর্থনীতিবিদ স্যার অ্যাডওয়ার্ড অস্টিন গোসেস রবিনসন বাংলাদেশের টিকে থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেন। যেহেতু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় তৎকালে এ দেশের জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি বেশি ছিল তাই তিনি নব্য এ রাষ্ট্রের ভবিষ্যতকে ম্যালথাসিয়ান স্ট্যাগনেশন এর সাথে তুলনা করলেন; অর্থাৎ এ রাষ্ট্রের শেষ পরিণতি হবে দূর্ভিক্ষের কবলে শুধুই নির্ঘাত মৃত্যু।

সে সময়কার মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বললেন, বাংলাদেশ একটি বটমলেস বাস্কেট বা তলাবিহীন ঝুড়ি, যে বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেন। বিশ্বের খ্যাতনামা ব্যক্তিবর্গের বিরূপ মন্তব্যের জবাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বললেন, “বাংলাদেশ এসেছে, বাংলাদেশ থাকবে।”

জাতির পিতার দৃঢ় কন্ঠে ঘোষিত সেদিনের বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল বিশ্বের অগ্রযাত্রায় অন্যতম সদস্য দেশ। দেশের প্রথম জাতীয় বাজেটের ৬৪ শতাংশ উন্নয়ন বরাদ্দ হিসেবে নির্ধারণ, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, দেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভূক্তি এবং বৈদেশিক বাণিজ্য প্রসারের মাধ্যমে এ যাত্রার শুরুটা বঙ্গবন্ধু নিজেই করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী চিন্তা-চেতনা এবং বর্তমান সরকারের যুগোপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ফলে আজ বাংলাদেশ বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির রাষ্ট্রের মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
জাতিসংঘ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) ধারণা প্রবর্তন করে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের ভিত্তিতে এলডিসি’র তালিকাভূক্তি নির্ধারিত হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত ৮৮ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এ দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে এলডিসি’র অন্তর্ভূক্ত হয়।

২০১৮ খ্রিস্টাব্দে এসে প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘের বেঁধে দেয়া মানদন্ডের তিনটি সূচকই পূরণ সাপেক্ষে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে; যদিও তিনটির যে কোনো দুটি অথবা শুধু মাথাপিছু আয় নির্ধারিত আয়ের দ্বিগুণ হলেই এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করা যায়।

নিয়মানুযায়ী, কোনো দেশ যোগ্যতা অর্জনের পর তিন বছর মেয়াদি দুটি পর্যবেক্ষণ পিরিয়ড শেষে চূড়ান্তভাবে এলডিসি থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। সে অনুযায়ী দেখা যায়, ২০২১ খ্রিস্টাব্দের পর্যবেক্ষণ শেষে বাংলাদেশ জাতিসংঘের বেঁধে দেয়া মাথাপিছু আয় সূচকে ন্যূনতম ১,২৩০ মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১,৮২৭ ডলার (গত ৩ বছরের গড়); মানবসম্পদ সূচকে ৬৫ এর পরিবর্তে ৭৫.৩ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে যেখানে বেঁধে দেয়া মান ৩২ বা এর কম সেখানে বাংলাদেশের অর্জন ২৭.২।

এ অর্জন সহজে রিভার্স করবে না; তাই ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট (সিডিপি)-এর ত্রি-বার্ষিক পর্যালোচনা সভায় বাংলাদেশকে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে এলডিসি থেকে বের হবার চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কোভিড-১৯ মোকাবিলা করে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে উন্নয়নশীল দেশের যাত্রা শুরু করার ক্ষেত্রে তিন বছরের প্রস্তুতিকাল যথেষ্ট না হওয়ায় সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রস্তুতিকাল আরও দুই বছর বাড়িয়ে চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ; অর্থাৎ ঐ বছরই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল অগ্রযাত্রা শুরু করবে।

উন্নয়নশীল যাত্রা শুরু করার সাথে সাথে বাংলাদেশের বর্তমানে ভোগকৃত স্বল্পোন্নত দেশের সুযোগ-সুবিধা হারাবে বা হ্রাস পাবে; যেমন- শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা, রপ্তানি পণ্যে ভর্তুকি প্রদানের সুবিধা, সহজ শর্তের বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান সহায়তা হ্রাস পাবে। বর্তমানে ভোগকৃত উক্ত সুবিধাগুলো হতে বঞ্চিত হয়ে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের তকমা লাগিয়ে সুদৃঢ় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এগিয়ে চলাই হবে চ্যালেঞ্জ।

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার মাত্র পাঁচ বছর প্রস্তুতির সময় পাচ্ছে। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে কোভিড-১৯ ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা মাথায় রেখে সরকারকে প্রয়োজন মাফিক লাভজনক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

অবশ্য, সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে; যেমন- ১. উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ক্ষেত্রে নিয়মানুযায়ী প্রাপ্য তিন বছরের প্রস্তুতিকালকে বাড়িয়ে পাঁচ বছরে উন্নীত করতে পেরেছে; ২. বিশ^ বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)’র সুবিধাগুলো আরও বারো বছর ভোগ করার জন্য প্রস্তাবনা পেশ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে; ৩. দ্বিপাক্ষিক অগ্রাধিকার বাণিজ্য সুবিধা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন দেশের সাথে আলোচনা ও সমীক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে, ইতোমধ্যে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভুটানের সাথে এ ধরনের একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করতে সক্ষম হয়েছে; ৪. বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সরকারি-বেসরকারি মিলে দেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে; ৫. প্রযুক্তির উৎকর্ষ কাজে লাগিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় হাই-টেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে এবং এ নির্মাণধারা অব্যাহত রয়েছে; ৭. বেকারত্ব হ্রাসের জন্য স্ব-উদ্যোগক্তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি ও উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে।

বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণের পর তৈরি হবে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ও সম্ভাবনা। রাষ্ট্রের সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন ধ্যাণ-ধারণা তৈরি হবে ফলে দেশের মানুষের আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধ সুদৃঢ় হবে; আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বহুগুণ বেড়ে যাবে।

বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি হলে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন রপ্তানি পণ্যের বাজারসহ (রপ্তানি বহুমুখীকরণের বাধ্যবাধকতার জন্য) বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শিল্পের প্রসার ঘটবে। দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটবে।

বিগত সময়ে সরকারের সাফল্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলে অনুমেয়, অগ্রিম চিন্তা-চেতনার ফলে নিকট ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার সক্ষম হবে।

তবে নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি করা, সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সাথে দর কষাকষি, বিভিন্ন খাতভিত্তিক সমীক্ষা পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রাখতে হবে।

 

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৮:২৮ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৮ জুন ২০২১

uttaraprotidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
আব্দুল্লাহ্ আল মাহমুদ বাবলু সম্পাদক
এনায়েত করিম প্রধান বার্তা সম্পাদক
প্রধান কার্যালয়

৫৩০ (২য় তলা), দড়িখরবোনা, উপশহর মোড়, রাজশাহী-৬২০২

ফোন: ০৭২১-৭৬০১৪৩, ০১৯৭৭১০০০২৭

E-mail: uttaraprotidin@gmail.com